সোমবার, ২১ মার্চ, ২০১১

টিভিতে আমার সাক্ষাৎকার - পাভেল রুমিয়ানৎসেভ

আমরা যা বলতে চাই আর যা শুনে থাকি তার মাঝে আকাশ পাতাল পার্থক্য হয়, যখন কেউ আমাদের কথা আর দেখার ভঙ্গিকে বিকৃত করে উপস্থাপন করে |ফলাফল: আমরা নিজেরা নিজেদের কথার উপর আস্থা হারাই , মনের মাঝে জন্ম নেয় অবিশ্বাসের| আত্মবিশ্বাসের ভিত হয় নড়বড়ে | মিডিয়া প্রপাগান্ডা যে কি নোংরা কর্ম তারই বহি প্রকাশ নিচের এই গল্পটি -

টিভিতে আমার সাক্ষাৎকার - পাভেল রুমিয়ানৎসেভ


হেঁটে যাচ্ছিলাম পথ ধরে। চমৎকার আবহাওয়া। বাসন্তিক। কোথাও যাওয়ার তাড়া নেই। প্রশান্তচিত্তে পাখিদের গান শুনছি। উপভোগের এমন মুহূর্ত বড়ই বিরল। সেই সময় হঠাৎ কানে এল প্রীতিকর নারীকণ্ঠ।
‘আপনার সঙ্গে একটু কথা বলতে পারি?’
ঘুরে তাকিয়ে দেখি, মাইক্রোফোন হাতে এক মেয়ে, আর জিনস পরা এক ছেলে, তার কাঁধে টিভি-ক্যামেরা। অদূরে এক গাড়ি দাঁড় করানো। সেখান থেকে তার চলে এসেছে এ পর্যন্ত। আমাদের শহরে টিভিকর্মী সচরাচর চোখে পড়ে না। আমার তাই কৌতূহল হলো। এগিয়ে গেলাম তাদের দিকে।
ছেলেটি টিভি-ক্যামেরা তাক করে ধরল মেয়েটির দিকে, আর মেয়েটি মাইক্রোফোনে বলতে শুরু করল, ‘আপনার পরিচয় দিন দয়া করে।’
সর্বনাশ! এরা দেখছি তাৎক্ষণিক সাক্ষাৎকার নিতে চাইছে! আমি নিজের পরিচয় জানালাম।
‘কোথায় কাজ করেন?’




আমি বললাম। দেখুক আমাদের ফ্যাক্টরির সবাই!
‘আপনাকে কয়েকটি প্রশ্ন করতে চাই। আপনার আপত্তি নেই তো?’
‘না।’ উত্তর দিলাম, ‘সারাটা জীবন স্বপ্ন দেখে এসেছি।’
‘আজকের আবহাওয়াটা দারুণ না?’
‘হ্যাঁ।’ বললাম।
‘কী চমৎকার রোদ্দুর, তাই না?’
‘হ্যাঁ।’ উত্তর দিয়ে মুচকি হাসলাম।
মন প্রফুল্ল থাকলে হাসবই না বা কেন! 
মেয়েটা বলেই চলল, ‘ছোট্ট নদীতে জল বয়ে চলেছে, ঠিক?’
‘হ্যাঁ।’
‘বসন্ত এসে পড়ছে?’
‘হ্যাঁ।’
‘পাখিরা গান গাইছে?’
‘হ্যাঁ।’
‘স্টপ! দারুণ রেকর্ডিং হয়েছে।’ একেবারে পেশাদারি ভঙ্গিতে কথাটা বলে ছেলেটার দিকে মুখ ফেরাল মেয়েটি। ‘অথচ তুমি বলেছিলে, উপযুক্ত লোক খুঁজে পাব না! এটা মফস্বল, মস্কো নয়, বুঝলে?’
ছেলেটা উত্তরে কী যেন বলল বিড়বিড় করে। তারপর তারা ক্যামেরা, মাইক্রোফোন আর তার গোটাতে শুরু করল।
‘এই যে ভাইয়েরা,’ ভারি রাগ হলো আমার, ‘কোন দিন দেখানো হবে, সেটা তো অন্তত বলবেন!’ 
‘রাতের সর্বশেষ সংবাদের জরিপ অংশে।’ জানাল মেয়েটি। ‘আজ আসি, ভাই। হাতে একদমই সময় নেই। রেকর্ডকৃত অংশ এডিট করতে হবে।’
বলে তারা চলে গেল। কেমন অদ্ভুত এই টিভির লোকজন! সব সময়ই তাদের তাড়া!
সন্ধের আগেই আমি আমার সব চেনা-পরিচিত ও আত্মীয়-পরিজনকে ফোন করে জানিয়ে দিলাম টিভিতে আমার আসন্ন সাক্ষাৎকারের কথা। আর নিজেরা পুরো পরিবার বসে পড়েছি টিভির সামনে। অপেক্ষা করছি, খবর দেখছি। কনিষ্ঠ সন্তান থেকে থেকেই জিজ্ঞেস করছে, ‘বাবা, তোমাকে কখন দেখাবে?’
আমার নিজেরই কৌতূহল হচ্ছে। এদিকে টিভিতে সরকারের বৈঠক দেখাচ্ছে। সেখানে ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে, সবকিছুর দাম তারা তিন গুণ বাড়িয়ে দেবে। বাড়ির ট্যাক্স, বিদ্যুৎ—সবকিছুর।
সেই সময় টিভির পর্দায় ভেসে উঠল সেই মেয়েটির মুখ।
সে বলছে, ‘আমরা সাধারণ জনগণের মধ্যে জরিপ চালিয়ে দেখেছি, অধিকাংশ লোকই আমাদের গণতান্ত্রিক সরকারের এ সিদ্ধান্ত সমর্থন করে। এই যে দেখুন, এক সাধারণ লোক হেঁটে যাচ্ছে, তাকে প্রশ্ন করা যাক।’
পর্দায় আমাকে দেখা গেল। তৃপ্ত, হাসিখুশি চেহারা। নিজের পরিচয় দিলাম, টিভি দর্শকদের উদ্দেশে। 
মেয়েটি জিজ্ঞেস করছে, ‘আপনি মূল্যবৃদ্ধির কথা শুনেছেন?’ 
ক্লোজ-আপে আমার মুখ দেখা গেল পর্দায়।
আমি বলছি, ‘হ্যাঁ।’ তারপর মুচকি হেসে যোগ করছি, ‘সারাটা জীবন স্বপ্ন দেখে এসেছি।’
বদমাশ মেয়েটা তারপর বলছে, ‘সমর্থন করেন?’
আমি ততোধিক আনন্দিত স্বরে বলছি, ‘হ্যাঁ।’
তারপর ট্যাক্সের ব্যাপারেও ‘হ্যাঁ’, বিদ্যুতের ব্যাপারেও ‘হ্যাঁ’...
এবং আমার প্রতিটি উত্তরই সহাস্য! 
এ ঘটনার পর আমাকে কত কথা যে সহ্য করতে হয়েছে! ফ্যাক্টরিতে সিগারেট ব্রেকের সময় সহকর্মীরা আমাকে ভুলিয়ে দিয়েছে ‘হ্যাঁ’ বলা। স্ত্রী চলে গেছে তার মায়ের কাছে এক মাসের জন্য। আর সরকার?...একটা মেডেল-ফেডেলও যদি দিত আমাকে! অবশ্য সরকারের ওপরে ভরসা না করাই ভালো।

---------
অনুবাদ - মাসুদ মাহমুদ (masud328@gmail.com) |
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন